নির্বাচন কমিশনের পাশে ৪২ প্রাক্তন বিচারপতি ও আধিকারিক, ‘ভোট চুরি’ অভিযোগ নিয়ে খোলা চিঠি
দেশের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই কমিশনের সমর্থনে সামনে এলেন ৪২ জন প্রাক্তন বিচারপতি ও উচ্চপদস্থ আধিকারিক। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি, কলকাতাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধীদের বিক্ষোভের আবহে দেশবাসীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন তাঁরা। চিঠিতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বিভিন্ন হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিদের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের একাধিক প্রাক্তন বিচারপতিও রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ এবং প্রমাণহীন অভিযোগ গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
খোলা চিঠিতে কী বললেন প্রাক্তন বিচারপতিরা?
খোলা চিঠিতে প্রাক্তন বিচারপতি ও আধিকারিকরা জানিয়েছেন, কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ‘ভোট চুরি’-র মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা উচিত নয়। তাঁদের মতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে জানানো দরকার।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রমাণহীন প্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই ধরনের প্রচার মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে কী অবস্থান তাঁদের?
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন চিঠির স্বাক্ষরকারীরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের আইনের আওতায় এই প্রক্রিয়া পরিচালনার আইনি ভিত্তি রয়েছে।
এসআইআরের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা যাচাই করা, মৃত ও স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটারদের নামের বিষয়টি খতিয়ে দেখা, ভুয়ো বা অযোগ্য নাম শনাক্ত করা এবং যোগ্য নতুন ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। তাঁদের মতে, সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য ভোটার তালিকা সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ।
চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও অভিযোগ বা আপত্তি থাকলে তা উপযুক্ত আইনি ও সাংবিধানিক পথে যাচাই করা উচিত বলেই তাঁদের বক্তব্য।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বজায় রাখার বার্তা
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর পড়তে পারে।
তাঁদের আশঙ্কা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি জনসাধারণের বিশ্বাস ভেঙে পড়লে দেশে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে দেশবিরোধী শক্তিও। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি বলে তাঁরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর জোর
নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের প্রতিবাদ এবং ‘ভোট চুরি’ অভিযোগের মধ্যেই ৪২ জন প্রাক্তন বিচারপতি ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকের এই খোলা চিঠি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে প্রাক্তন বিচারপতি ও আধিকারিকদের একাংশ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, এই চিঠির মূল বক্তব্য হলো—নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া গুরুতর অভিযোগ তোলা থেকে বিরত থাকা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে খোলা চিঠির বক্তব্য ও স্বাক্ষরকারীদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও আইনি ব্যাখ্যাগুলি সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচ্য। প্রকাশের আগে চিঠির মূল কপি, স্বাক্ষরকারীদের তালিকা এবং এসআইআর সংক্রান্ত আদালতের পর্যবেক্ষণ যাচাই করে নেওয়া উচিত।

